
বরিশালের রহস্যময় ‘পাক্কা বাড়ি’: জলদস্যু, মোঘল না কি চন্দ্রদ্বীপের দুর্গ?
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার এককরিয়া ইউনিয়নের পূর্ব ইয়ারবেগ গ্রামে জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো এক রহস্যময় স্থাপনা—যা স্থানীয়দের কাছে ‘পাক্কা বাড়ি’ নামে পরিচিত। কে নির্মাণ করেছে এই দালান, আর কী উদ্দেশ্যে—তা নিয়ে আজও নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি ইতিহাসবিদরা।
জঙ্গলের ভেতরে অন্ধকার এক স্থাপনা
চারপাশে ঘন বনজঙ্গল, নির্জন পরিবেশ এবং আলো–বাতাসহীন অভ্যন্তর—পাক্কা বাড়িতে প্রবেশ করলেই অনেকের গা ছমছম করে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষায় এটি ‘অন্ধ কুট’ বা ‘অন্ধকার কূপ’ নামেও পরিচিত।
দোতলা এই পুরোনো পাকা ভবনটিতে রয়েছে মোট ছয়টি কক্ষ। সামনে একটি বড় দিঘি, সিঁড়ির গোড়ায় একসময় ছিল বড় গর্ত, যা বর্তমানে মাটি দিয়ে ভরাট। একসময় পুরো ভবনটি প্রাচীরবেষ্টিত ছিল বলেও জানা যায়, যদিও সেই প্রাচীর এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত।
প্রতিরক্ষা স্থাপনার আলামত
ভবনের দেয়ালে ছয় ইঞ্চি ব্যাসার্ধের গোলাকার ছিদ্র রয়েছে, যেগুলো দিয়ে ভেতর থেকে বাইরে নজরদারি করা যেত এবং শত্রুর ওপর আক্রমণ চালানো সম্ভব ছিল বলে ধারণা করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এসব ছিদ্র থেকে তীর, বর্শা, পাথর এমনকি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
ভবনের ভেতরে রয়েছে প্রবেশ গেট, দোতলায় একটি চৌবাচ্চা—যাকে স্থানীয়রা ‘জল পুকুর’ বলেন—এবং একটি সুরঙ্গপথ, যার উচ্চতা প্রায় চার ফুট। চুন-সুড়কি দিয়ে নির্মিত এই ভবনে বিভিন্ন ধরনের ইট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
মোঘল আমল না জলদস্যুদের ঘাঁটি?
অনেকে মনে করেন, পাক্কা বাড়িটি মোঘল আমলের স্থাপনা। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যে এখানে কোনো মোঘল সুবেদার বা তাদের প্রতিনিধি বসবাস করেছেন।
বরং ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ বাংলার এই দ্বীপাঞ্চল একসময় জলদস্যুদের দখলে ছিল। ভোলা, মনপুরা, হিজলা, মুলাদী, সন্দ্বীপ ও হাতিয়া অঞ্চলে পর্তুগিজ, মগ ও বর্গী জলদস্যুরা দীর্ঘদিন লুটতরাজ ও নির্যাতন চালায়।
ভবনটির জনবিচ্ছিন্ন অবস্থান, ধর্মীয় স্থাপনার অনুপস্থিতি, দেয়ালের গোলাকার ছিদ্র এবং দুর্গসদৃশ নকশা—এসব কারণে গবেষকদের একাংশ ধারণা করছেন, এটি জলদস্যুদের একটি প্রধান আস্তানা হতে পারে।
শাহবাজ খান ও আগা মেহেদীর অভিযান
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৫৮৩ সালে মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি শাহবাজ খান এই অঞ্চলে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তার স্মৃতিতেই এই অঞ্চল ‘শাহবাজপুর’ নামে পরিচিত হয়।
পরবর্তীতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সেনাপতি আগা মেহেদী আবারও জলদস্যু দমনে আসেন এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার নাম থেকেই বর্তমান ‘মেহেন্দিগঞ্জ’ নামটির উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।
চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের সম্ভাব্য নিদর্শন?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, পাক্কা বাড়িটি মোঘল-পূর্ব যুগের চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের কোনো দুর্গ হতে পারে। চন্দ্রদ্বীপ, যা বাকলা চন্দ্রদ্বীপ নামেও পরিচিত ছিল, একসময় দক্ষিণ বাংলার একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল।
চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্প নারায়ণ রায় বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় শক্ত দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। পাক্কা বাড়ির সুরক্ষিত অবকাঠামো সেই সময়ের দুর্গ নির্মাণ কৌশলের সঙ্গে মিল রাখে।
লোককথা ও রহস্য
পাক্কা বাড়িকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। কেউ বলেন, এটি অলৌকিকভাবে মাটির নিচ থেকে উঠে এসেছে। আবার সবচেয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এক সর্পরাজ মানুষের রূপ ধারণ করে এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন।
আরও একটি বিশ্বাস হলো—সিঁড়ির গোড়ার গর্তে কিছু ফেললে তা সামনের দিঘিতে ভেসে উঠত।
সংরক্ষণের দাবি
বর্তমানে পাক্কা বাড়িটি অবহেলায় পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে অনেক জায়গা দখল হয়ে গেছে, ভবনটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় এনে যথাযথ খনন ও গবেষণা চালানো হলে এই রহস্যময় স্থাপনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, পাক্কা বাড়ি সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এটি দক্ষিণ বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।