ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ একেবারে দ্বারপ্রান্তে। রাত পোহালেই ভোটের ট্রেন পৌঁছাবে গন্তব্যে। এই নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে বরিশাল-৪ আসনজুড়ে। মেঘনা, কালাবদর ও তেতুলিয়া নদীবেষ্টিত হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা এবং প্রশাসনিক থানা কাজিরহাট নিয়ে গঠিত এই আসনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় নির্বাচন।
সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্গম জনপদ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যেও এবারের নির্বাচন ঘিরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বাড়তি আগ্রহ ও নির্বাচনী আমেজ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২১ হাজার ৯৭৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ৯৪২ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪ হাজার ৩০ জন।
এই আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াইটি কেন্দ্রীভূত হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ঘিরে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রাজীব আহসান এবং জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বারকেই ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।
বরিশাল-৪ আসনের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস বিএনপির পক্ষে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও বিএনপি আসনটি ধরে রাখবে—এমন প্রত্যাশা করছেন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, নদীঘেরা গ্রাম ও জনপদে ধারাবাহিক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নদীভাঙন রোধ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের সমস্যা শোনার চেষ্টা করছেন রাজীব আহসান। স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এলাকার বাস্তবতা সম্পর্কে তার ধারণা এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি তাকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। তবে দলীয় অভ্যন্তরে গ্রুপিং ও কিছু কোন্দল তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বরিশাল জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় জামায়াতের একটি নির্দিষ্ট ও সংগঠিত ভোটব্যাংক তার পক্ষে সক্রিয় রয়েছে। তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির কথা তুলে ধরছেন।
জামায়াতের স্থানীয় সাংগঠনিক ভিত্তি বরিশাল-৪ আসনে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী এই আসনে দ্বিতীয় এবং ১৯৯৬ সালে তৃতীয় হলেও বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল খুবই কম। এছাড়া গোবিন্দপুর, বড়জালিয়া ও অবিভক্ত উলানিয়া ইউনিয়নে অতীতে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা একাধিকবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন।
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আসনে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ভাষায়, এটি হতে যাচ্ছে বিএনপির নবীন প্রার্থী বনাম জামায়াতের অভিজ্ঞ প্রার্থীর একটি জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
সব হিসাব-নিকাশের শেষ উত্তর মিলবে ভোটের বাক্স খোলার পর। তবে ভোটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বরিশাল-৪ আসনে বিএনপি ও জামায়াত—দুই পক্ষেরই তৎপরতায় নির্বাচনী উত্তেজনা এখন চরমে